April 19, 2021

Jagobahe24.com news portal

Real time news update

বিজয়ের মাসেই দৃশ্যমান হচ্ছে স্বপ্নের পদ্মা সেতু

বিজয়ের মাসেই দৃশ্যমান হচ্ছে স্বপ্নের পদ্মা সেতু

বিজয়ের মাসেই দৃশ্যমান হচ্ছে স্বপ্নের পদ্মা সেতু

বিশ্বব্যাংকের ভুয়া দুর্নীতির অভিযোগ, নদীর নাব্যতা সংকট , আবার স্রোতের তীব্রতা, নকশা জটিলতা, সর্বশেষ করোনার ধাক্কাসহ সব বাঁধা পেরিয়ে পদ্মা সেতু এখন স্বপ্ন  থেকে সত্যি। আগামী ১০ ডিসেম্বরের মধ্যেই সব কটি (৪১টি) স্প্যান বসানোর কাজ শেষ হবে। অর্থাৎ এবার বিজয় দিসবের আগেই পদ্মা সেতু সম্পূর্ণ দেখা যাবে। আর বিজয়ের সবুর্ণজয়ন্তীতে যান চলাচলের জন্য খুলে দেওয়ার পরিকল্পনা নিয়েই দিন-রাত নির্মাণ কাজ এগিয়ে চলছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে।    গতকাল বৃহস্পতিবার সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের বাংলাদেশ সেতু কর্তৃপক্ষের ১০৯তম বোর্ড সভায় ভিডিও কনফারেন্সে যুক্ত হয়ে সেতু বিভাগের ২০১৯-২০২০ অর্থবছরের বার্ষিক প্রতিবেদনের মোড়ক উন্মোচনশেষে বলেন, পদ্মা বহুমুখী সেতুর ৪১টি স্প্যানের মধ্যে ইতোমধ্যে ৩৭টি স্প্যান স্থাপন করা হয়েছে। এতে সেতুর পাঁচ দশমিক ৫৫ কিলোমিটার এখন দৃশ্যমান। নদীর স্রোত প্রত্যাশিত লেভেলে থাকলে অবশিষ্ট চারটি স্প্যান ডিসেম্বর মাসের মাঝামাঝি সময়ের মধ্যে স্থাপন করা হবে। তিনি আরো বলেন, মূল সেতুর বাস্তব কাজের অগ্রগতি ৯১ শতাংশ। নদীশাসন কাজের বাস্তব অগ্রগতি প্রায় ৭৫ শতাংশ। প্রকল্পের সার্বিক অগ্রগতি ৮২ শতাংশ।
পদ্মা সেতুর নির্বাহী প্রকৌশলী ও প্রকল্প ব্যবস্থাপক (মূল সেতু) দেওয়ান মো. আব্দুল কাদের জানান, ছয় দশমিক ১৫ কিলোমিটার দীর্ঘ দ্বিতল পদ্মা সেতুর চারটি স্প্যান বসানো বাকি আছে। চারটি স্প্যানের মধ্যে দুইটির রঙ করা শেষ হয়েছে। বাকি দুইটির রঙ করার কাজ শেষের পথে। তিনি আরো বলেন, ২৩ নভেম্বর পিয়ার ১০ ও ১১ নম্বরে ৩৯তম স্প্যান ‘২-ডি’, ২ ডিসেম্বর পিয়ার ১১ ও ১২ নম্বরে ৪০তম স্প্যান ‘২-ই’ এবং ১০ ডিসেম্বর সর্বশেষ ৪১ নম্বর স্প্যান ‘২-এফ’ ১২ ও ১৩ নম্বর পিয়ারের ওপর বসানোর পরিকল্পনা রয়েছে।
জানা গেছে, ৪১টি স্প্যানের ছোট ছোট অংশগুলো প্রথমে তৈরি করা হয় চীনে। পরে জাহাজে করে দীর্ঘ সমুদ্রপথ পাড়ি দিয়ে আনা হয় বাংলাদেশের কন্সট্রাকশন এলাকায়। সেখানে ছোট অংশগুলো একটির সঙ্গে আরেকটি ঝালাই দিয়ে ১৫০ মিটার দৈর্ঘ্যের প্রত্যেকটি স্প্যান তৈরি করা হয়। তারপরে প্রতিটি স্প্যান ধূসর রঙে রাঙিয়ে পিয়ারে তোলা হয়। তবে, তার আগে কন্সট্রাকশন ইয়ার্ডের স্টিল ট্রাস জেটি থেকে তিয়ান-ই ক্রেনে করে পিয়ারের উদ্দেশে রওনা দেয়। আবহাওয়া অনুকূলে থাকলে ও কারিগরি জটিলতা না থাকলে একদিনেই একটি স্প্যান পিয়ারের ওপর স্থাপন করা হয়। তবে আবহাওয়া প্রতিকূলে থাকলে, আলোক স্বল্পতা দেখা দিলে, নদীতে তীব্র স্রোত বা নাব্য সংকট থাকলে কখনো কখনো স্প্যান বসাতে দুই দিন লেগেছে।
মূল সেতু নির্মাণের কাজ করছে চীনের ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান চায়না রেলওয়ে মেজর ব্রিজ ইঞ্জিনিয়ারিং গ্রুপ কোম্পানি লিমিটেড (এমবিইসি) ও নদী শাসনের কাজ করছে চীনের আরেকটি প্রতিষ্ঠান সিনো হাইড্রো করপোরেশন। সংযোগ সড়ক নির্মাণ করেছে বাংলাদেশের আব্দুল মোমেন লিমিটেড।
এদিকে, স্প্যান বসানোর পাশাপাশি সেতুর অন্যান্য কাজও দ্রুত এগিয়ে চলছে। সেতুর মাসিক অগ্রগতির রিপোর্ট অনুসারে ৩১ অক্টোবর পর্যন্ত দুই হাজার ৯১৭টি রোডওয়ে স্ল্যাবের মধ্যে বসানো হয়েছে এক হাজার ১৬৬টি এবং দুই হাজার ৯৫৯টি রেলওয়ে স্ল্যাবের মধ্যে এক হাজার ৬৪৬টির বেশি বসানো শেষ। সেতুর উভয় প্রান্তে ভায়াডাক্টের ৪৮৪টি সুপার-টি গার্ডারের মধ্যে স্থাপন হয়েছে ২৫৮টি।
সেতুর নির্মাণ কাজ শুরু হয়েছিল ২০১৪ সালের ডিসেম্বরে এবং শেষ হওয়ার সংশোধিত শিডিউল ২০২১ সালের জুন মাসে। মূল সেতুর কাজ করছে চীনের ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান চায়না মেজর ব্রিজ ইঞ্জিনিয়ারিং কোম্পানি। আর নদীশাসনের কাজ পেয়েছে চীনের আরেক প্রতিষ্ঠান সিনোহাইড্রো করপোরেশন। তাদের কাজ শুরুর চিঠি দেওয়া হয় ২০১৪ সালের নভেম্বরে। পরবর্তী চার বছরে ২০১৮ সালে কাজ শেষ করার কথা ছিল।
প্রকল্প সূত্রে জানা গেছে, সেতুর প্রথম স্প্যান বসে ২০১৭ সালের ৩০ নভেম্বর। এরপর প্রায় চার মাস পর দ্বিতীয় স্প্যানটি বসানো হয়। প্রথম দিকে দুই-তিন মাস পরপর স্প্যান বসানো হতো। ২০১৮ সালের শেষের দিক থেকে মাসে একাধিক স্প্যান বসানো হয়।  স্রোত কমে যাওয়ায় গত মাস থেকে দ্রুত স্প্যান বসানো হচ্ছে।
প্রকল্পের নথি থেকে জানা গেছে, পাইলিংসহ নানা জটিলতার কারণে ইতিমধ্যে মূল সেতুর ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানকে আনুষ্ঠানিকভাবে পৌনে তিন বছর বাড়তি সময় দিয়েছে প্রকল্প কর্তৃপক্ষ। নদীশাসনেও ঠিকাদারকে আড়াই বছর বাড়তি সময় দেওয়া হয়েছে। সময় বাড়ানোর পেছনে কারণগুলোর মধ্যে রয়েছে ঠিকাদারকে সময়মতো জমি বুঝিয়ে না দেওয়া, নদীভাঙন এবং নদীর তলদেশে গভীর গর্তের সৃষ্টি অন্যতম।
সূত্র  জানায়, নকশা সংশোধন ও নদীশাসনে বিলম্বের কারণে পদ্মা সেতু প্রকল্পের কাজ আগেই পিছিয়েছিল। করোনা সংক্রমণ পরিস্থিতি এবং বন্যার স্রোতের কারণে চার মাস স্প্যান বসানো যায়নি। তবে গত মাস থেকে ফের কার্যক্রম শুরু হয়েছে। আগামী মাসে স্প্যান বসানো শেষ হলে ট্রেন চলাচলের জন্য লাইন স্থাপন শুরু হবে। একই সঙ্গে যানবাহন চলাচলের রাস্তা বানানোর কাজ শেষ করতে হবে। এরপরই সেতুটি চালু করা যাবে।
পদ্মা সেতু প্রকল্প বাস্তবায়নে যুক্ত দায়িত্বশীল সূত্র জানায়, সময়মতো কাজ না হওয়ার দায় ঠিকাদার নিচ্ছে না। তারা বলছে, ২২টি খুঁটির (পিলার) পাইলিং সংক্রান্ত নকশা সংশোধন, নদীশাসন কাজে বিলম্ব এবং নদীভাঙন ও প্রবল স্রোতের কারণে কাজ পিছিয়েছে। সরকারও ঠিকাদারের দাবি মেনে নিয়েছে। ফলে বাড়তি সময়ের পুরো দায় বহন করতে হচ্ছে সরকারকে। যেমন দেরির কারণে পণ্যের মূল্যবৃদ্ধির (প্রাইস এসকেলেশন) খেসারত দিতে হচ্ছে সরকারকে। এ সময়ে যেসব লোকবল ব্যবহার করছে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান, এরও খরচ বহন করতে হবে বাংলাদেশকে। এমনকি নির্মাণকাজে ব্যবহৃত যন্ত্রপাতির বাড়তি সময়ে ব্যবহারের খরচও চাইছে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান। সব মিলিয়ে সেতু নির্মাণের সময় ও ব্যয় দুটোই বাড়ছে।
২০০৭ সালে একনেকে পাস হওয়া পদ্মা সেতু প্রকল্পের ব্যয় ছিল ১০ হাজার ১৬২ কোটি টাকা। ২০১১ সালে ব্যয় বাড়িয়ে করা হয় ২০ হাজার ৫০৭ কোটি টাকা। ২০১৬ সালে দ্বিতীয় দফা সংশোধনের পর ব্যয় দাঁড়ায় ২৮ হাজার ৭৯৩ কোটি। এরপর প্রকল্প প্রস্তাব সংশোধন না করে ২০১৮ সালের জুনে আবারো ব্যয় বেড়ে দাঁড়ায় ৩০ হাজার ১৯৩ কোটি টাকা। পদ্মা নদীর চরে এক হাজার ১৬৩ হেক্টর জমি অধিগ্রহণের কারণে সর্বশেষ এক হাজার ৪০০ কোটি টাকা ব্যয় বাড়ে। তবে বিপুল ব্যয়ে কেনা সেই চরের জমি সাম্প্রাতিক বন্যার পানির টানে অনেকটা বিলীন হয়ে গেছে।
জানতে চাইলে প্রকল্প পরিচালক শফিকুল ইসলাম বলেন, পদ্মা নদী পৃথিবীর জটিল নদীর একটি। প্রকল্পের কাজও বেশ জটিল। এর মধ্যে নানা চ্যালেঞ্জ এসেছে, সেগুলো উতরানো গেছে। এখন করোনা পরিস্থিতির কারণে কাজ স্থবির ছিল। তবে এখনো সময়মতো কাজ শেষ করার ব্যাপারে আশাবাদী আমরা। ব্যয় বৃদ্ধির বিষয়ে তিনি বলেন, কিছু বাড়তি কাজ করতে হয়েছে। এর জন্য ব্যয় বাড়বে। আবার কিছু কাজে ব্যয় কমেছেও। তবে চূড়ান্ত ব্যয় জানতে হলে অপেক্ষা করতে হবে।