September 22, 2021

Jagobahe24.com

সত্যের সাথে আপোসহীন

প্রাথমিকের ৩০ লাখ শিক্ষার্থী উচ্চপুষ্টিমানের বিস্কুট না পেয়ে অপুষ্টির শিকার হচ্ছেন

প্রাথমিকের ৩০ লাখ শিক্ষার্থী উচ্চপুষ্টিমানের বিস্কুট না পেয়ে অপুষ্টির শিকার হচ্ছেন

প্রাথমিকের ৩০ লাখ শিক্ষার্থী উচ্চপুষ্টিমানের বিস্কুট না পেয়ে অপুষ্টির শিকার

প্রাথমিকের কোমলমতি শিক্ষার্থীদের মধ্যে বিস্কুট বিতরণ তথা ‘দারিদ্র্য পীড়িত এলাকায় স্কুল ফিডিং প্রকল্পে’র মেয়াদ ছয় মাস বাড়লেও নতুন করে কার্যক্রম শুরু হয়নি। এরই মধ্যে বর্ধিত সময়ের তিন মাস অতিক্রম করলেও বৃহস্পতিবার পর্যন্ত প্রকল্পের অর্থ ছাড় হয়নি। ফলে প্রাথমিকের ৩০ লাখ শিক্ষার্থী উচ্চপুষ্টিমানের বিস্কুট না পেয়ে অপুষ্টির শিকার হচ্ছেন। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ থাকায় এসব শিক্ষার্থী ঝরে পড়ার আশঙ্কা রয়েছে।
অভিযোগ রয়েছে, প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়ের একজন শীর্ষ কর্মকর্তার কারণে প্রকল্পের কার্যক্রম শুরু হচ্ছে না। তার ইচ্ছার বিরুদ্ধে প্রকল্পের মেয়াদ বাড়ায় কার্যক্রম শুরু করতে সময় ক্ষেপন করছেন। এমন কি মন্ত্রণালয়ের একজন অতিরিক্ত সচিবকে দিয়ে ফোন করে প্রকল্পে কর্মরত প্রশাসন ক্যাডারের দুই শীর্ষ কর্মকর্তাকে সরে যেতে বলেছেন।
জানা গেছে, গত ১৭ আগস্ট শর্তসাপেক্ষে গত জুলাই থেকে ডিসেম্বর পর্যন্ত ছয় মাস প্রকল্পের মেয়াদ বাড়িয়ে প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়কে চিঠি দিয়েছে পরিকল্পনা কমিশন। এর এক সপ্তাহ পর প্রকল্পের মেয়াদ বাড়ানোর সিদ্বান্তের কথা প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তরকে (ডিপিই) জানায় মন্ত্রণালয়। ওই চিঠি পেয়ে ডিপিই প্রকল্পের কার্যক্রম শুরু করার জন্য প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে মন্ত্রণালয়ে চিঠি পাঠায়। কিন্তু মন্ত্রণালয় বৃহস্পতিবার পর্যন্ত কোনো উদ্যোগ নেয়নি।  
মন্ত্রণালয় ও ডিপিই সূত্রে জানা গেছে, কোনো প্রকল্পের মেয়াদ বাড়াতে হলে প্রধানমন্ত্রীর সম্মতির জন্য ফাইল পাঠাতে হয় না। সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় পরিকল্পা কমিশনে প্রস্তাব পাঠালে তা পর্যালোচনা করে অনুমোদন দেয়। এর আগে ‘দারিদ্র্য পীড়িত এলাকায় স্কুল ফিডিং প্রকল্প’র মেয়াদ বাড়ানোর জন্য প্রধানমন্ত্রীর মতামতের জন্য প্রস্তাব পাঠনো হয়নি। এবার প্রকল্পের মেয়াদ বাড়াতে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সম্মতি চেয়ে প্রস্তাব পাঠায় প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়। গত ৭ জুলাই  প্রধানমন্ত্রীর সম্মতির বিষয়টি জানিয়ে মন্ত্রণালয়ে চিঠি দেয় প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়। এরপর প্রকল্পের মেয়াদ বাড়াতে ডিপিইকে ফের প্রস্তাব পাঠাতে নির্দেশ দেয় মন্ত্রণালয়। এভাবে সময় নষ্ট করা হয়।  
গত ১ জুন একনেক সভায় প্রধানমন্ত্রী ‘প্রাইমারি স্কুল মিল প্রকল্প’ অনুমোদন না দিয়ে ডিপিপি সংশোধনের প্রস্তাব দেন। নতুন প্রকল্প অনুমোদন না হওয়ায় এবং বিস্কুট বিতরণ প্রকল্পের মেয়াদ গত ৩০ জুন শেষ হয়ে যায়। নতুন প্রকেল্পর ডিপিপি সংশোধন করতে অন্তত এক বছর সময় লাগবে। এই সময়ে বিস্কুট বিতরণ প্রকল্পের সুবিধাভোগী ৩০ লাখ শিক্ষার্থী অপুষ্টি ও ঝরে পড়া আশঙ্কা থেকে ডিপিই ব্যয় না বাড়িয়ে আরো এক বছর প্রকল্পের মেয়াদ বাড়াতে মন্ত্রণালয়ে প্রস্তাব পাঠায়। গত ১০ জুন প্রস্তাবটি পাঠানো হলেও মন্ত্রণলয়ে সচিব পরিকল্পনা কমিশনে না পাঠিয়ে সময়ক্ষেপণ করেন। এ নিয়ে আজকালের খবরে সংবাদ প্রকাশের পর প্রতিমন্ত্রী মো. জাকির হোসেন দ্রুত ব্যবস্থা নিতে সচিবকে নির্দেশ দেন। সচিব কৌশল করে প্রকল্পের মেয়াদ বাড়ানোর বিষয়ে প্রধানমন্ত্রীর মতামতের জন্য ফাইল পাঠায় প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে। একই সঙ্গে এক বছরের পরিবর্তে ছয় মাসের নতুন প্রস্তাব পাঠাতে বাধ্য করে ডিপিইকে।
সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানান, প্রকল্পের মেয়াদ বাড়াতে হলে যৌক্তিকতা তুলে ধরে পরিকল্পনা কমিশনে প্রস্তাব পাঠাতে হয়। অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগ প্রস্তাব যাচাই বাছাই করে প্রকল্পের মেয়াদ বাড়ায় সরকার। প্রাথমিক ও গণশিক্ষা সচিব প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে প্রস্তাব পাঠালে সেখানকার উচ্চপর্যায়ের কর্মকর্তারা সচিবের দক্ষতা নিয়ে প্রশ্ন তোলেন। 
অভিযোগ রয়েছে, বিকাশ, রকেটসহ এজেন্ট ব্যাংকিং এর মাধ্যমে শিক্ষার্থীদের অভিভাবকদের মোবাইলে সরাসরি টাকা পাঠাতে চেয়ে ছিলেন সচিব। হতদরিদ্র অভিভাবকদের ফোনে সরাসরি টাকা পাঠালে শিশুদের পুষ্টির চাহিদা পূরণ হবে না। অভিভাবকরা নিজেদের প্রয়োজনে খরচ করে ফেলবেন। এর নেপথ্যে ছিল সচিবের কমিশন বাণিজ্যের ধান্ধা! প্রতিমন্ত্রীর চাপে শেষ পর্যন্ত প্রকল্পের মেয়াদ ছয় মাস বাড়লেও সচিব এখন কার্যক্রম শুরু করতে টালবাহানা করছেন। ফলে ৩০ লাখ শিক্ষার্থী পুষ্টিকর বিস্কুট থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন।
জানতে চাইলে প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়ের সচিব গোলাম মো. হাসিবুল আলাম নিজ দপ্তরে আজকালের খবরকে বলেন, প্রকল্পের মেয়াদ বাড়ানোর অনুমোদন হলেও অর্থমন্ত্রণালয় অর্থ ছাড় না করায় কার্যক্রম শুরু করা যাচ্ছে না। প্রকল্পের মেয়াদ শেষ হয়ে যাওয়ায় অর্থ ফ্রিজ হয়ে আছে। এটি ছাড় করার উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে।
প্রকল্প সূত্রে জানা গেছে, দেশের দরিদ্র পীড়িত ১০৪টি উপজেলায় ২০১০ সাল থেকে প্রকল্পের অধীনে ৩০ লাখ শিক্ষার্থীকে প্রতিদিন ৭৫ গ্রামের এক প্যাকেট বিস্কুট বিতরণ করা হয়। বিস্কুট থেকে একজন শিক্ষার্থী প্রতিদিন ৩৩৮ কিলো ক্যালরি শক্তি পায়। প্রকল্পটি প্রথম দফায় ২০১০ সালের ১ জুলাই থেকে ২০১৪ সালের ৩০ জুন পর্যন্ত বাস্তাবায়ন করা হয়। পরবর্তীসময়ে প্রকল্প সংশোধন করে গত বছরের ৩১ ডিসেম্বর পর্যন্ত বৃদ্ধি করা হয়। প্রকল্পের ব্যয় ধরা হয় ১১৪২ কোটি ৭৯ লাখ ৯১ হাজার টাকা। এরমধ্যে জিওবি ৫৯৭ কোটি ৭০ লাখ ৫৭ হাজার ও প্রকল্প সাহায্য ৫৪৫ কোটি নয় লাখ ৩৪ হাজার টাকা।
বিস্কুট বিতরণের সফলতা থেকে সারা দেশের প্রাথমিকের শিক্ষার্থীদের দুপুরে খাবর দিতে প্রণয়ন করা হয় জাতীয় স্কুল মিল নীতিমাল-২০১৯। নীতিমালা অনুযায়ী ‘প্রাইমারি স্কুল মিল প্রকল্প’টি গত ১ জুন একনেকে উত্থাপন করা হয়। শিক্ষার্থীদের দুপুরের খাবর খিচুড়ি দেওয়ার প্রস্তাব করায় প্রধানমন্ত্রী ডিপিপি সংশোধনের নির্দেশ দিয়েছেন। এর আগে প্রকল্প বাস্তবায়নে বিদেশে সফর রাখায় একনেক থেকে প্রকল্পটি ফেরত পাঠানো হয়। এ নিয়ে দেশজুড়ে ব্যাপক সমালোচনায় পড়তে হয় সরকারকে।  
দারিদ্র্য পীড়িত এলাকায় স্কুল ফিডিং প্রকল্পটি গত ডিসেম্বরে শেষ হয়ে যাওয়ার কথা ছিল। কিন্তু ‘প্রাইমারি স্কুল মিল প্রকল্প’ প্রকল্পটির অনুমোদনে বিলম্বের কারনে ব্যয় না বাড়িয়ে চলতি বছরের ৩০ জুন পর্যন্ত আরেক দফা মেয়াদ বাড়ানো হয়। করোনার কারণে গত বছরের ১৭ মার্চ থেকে স্কুল বন্ধ থাকায় শিক্ষার্থীরা যাতে ঝরে না পড়ে সেজন্য চলমান প্রকল্পের মেয়াদ বাড়ানো হয়েছিল। মহামারির মধ্যেও শিক্ষকরা শিক্ষার্থীদের বাড়ি বাড়ি গিয়ে বিস্কুট বিতরণ করেন। প্রকল্পের মেয়াদ ৩০ জুন পর্যন্ত জিওবি খাতের ৪৭৩ কোটি নয় লাখ টাকা খরচ হয়নি। এ টাকা দিয়ে আগামী এক বছর প্রকল্পের মেয়াদ বাড়ানোর প্রস্তাব করেছিল ডিপিই।
সচিবের বিরুদ্ধে নানা অভিযোগ: মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, গত নভেম্বরে মন্ত্রণালয়ে সচিব হয়ে যোগদান করার পর অতিরিক্ত সচিব থেকে সকল স্তরের কর্মকর্তা-কর্মচারিদের সঙ্গে সব সময়ে বৈরি আচরণ করেন। ১০ শতাংশ কোটায় বিভিন্ন ক্যাডার থেকে উপসচিব হয়ে বর্তমানে প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়ে কর্মরত কর্মকর্তাদের তুচ্ছ তাচ্ছিল্য করে কথা বলেন। তাদেরকে ঠিক মতো কাজ করতে দেওয়া হয় না।  
কর্মকর্তাদের অভিযোগ, সচিবের আচরণে এরই মধ্যে মন্ত্রণালয় ও এর অধীন অধিদপ্তরের তিনজন অতিরিক্ত সচিব, চারজন যুগ্ম-সচিব ও পাঁচজন উপসচিবসহ ১৪ কর্মকর্তা তদবির করে অন্য মন্ত্রণালয়ে বদলি হয়ে চলে গেছেন। ডিপিইর ডিজিও বদলির জন্য চেষ্টা করছেন। বর্তমানে ডিপিই’র অতিরিক্ত মহাপরিচালকের একটি, পরিচালকের দুটি, মন্ত্রণালয়ের যুগ্ম-সচিবের দুটি, উপসচিবের পাঁচটিসহ প্রায় এক ডজন পদ শূন্য থাকলেও কেউ পদায়ন নিতে চান না। এসব বিষয়ে মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের সচিব তাকে ডেকে ভৎসনা করেছেন বলে সূত্র জানিয়েছে।
অভিযোগ রয়েছে, প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়ের সকল অবকাঠামো নির্মাণ কাজ এলইজিডির মাধ্যমে বস্তবায়ন করা হয়। এই সুযোগ নিয়ে সচিব এলজিইডি থেকে একটি দামি গাড়ি পরিবারের ব্যবহারের জন্য নিয়েছেন। সেদিন তেল খরচসহ সকল ব্যয় এলজিইডি বহন করে। এছাড়া সচিবের বাসায় গৃহপরিচারিকার কাজের জন্য সরকারিভাবে মাস্টার রোলে দুই জন কর্মচারির বেতন বাবদ মাসে ৩০ হাজার টাকা পান। ওই টাকা সচিব তুলে নিলেও কোনো কর্মচারি নিয়োগ দেওয়া হয়নি। সচিবের বাসায় মন্ত্রণালয়ের এলএমএসএস জাহিদকে দিয়ে সকল কাজ করানো হয়।
এসব অভিযোগের বিষয়ে সচিব গোলাম মো. হাসিবুল আলামের কাছে জানতে চাইলে তিনি কোনো মন্তব্য করেননি।