July 26, 2021

Jagobahe24.com news portal

Real time news update

ঘাতকেরা শৈশব কেড়ে নিলেও 'পরশ-তাপস' আজ আলোকিত

ঘাতকেরা শৈশব কেড়ে নিলেও 'পরশ-তাপস' আজ আলোকিত

ঘাতকেরা শৈশব কেড়ে নিলেও ‘পরশ-তাপস’ আজ আলোকিত

স্বাধীনতার সাড়ে তিন বছরের মাথায় স্বাধীনতার মহান স্থপতি জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবর রহমানের নেতৃত্বে বাংলাদেশ যখন বিশ্বের দরবারে মাথা উঁচু করে দাঁড়াতে যাচ্ছিল, ঠিক তখনই ৭৫ এর ১৫ ই আগস্ট স্বাধীনতার পরাজিত শত্রুরা, দেশি ও বিদেশি চক্রান্তে অত্যন্ত নির্মমভাবে বঙ্গবন্ধুকে সপরিবারে হত্যা করা করেন। বিদেশে থাকায় ভাগ্যক্রমে বেঁচে যান বঙ্গবন্ধুর দুই কন্যা শেখ হাসিনা ও শেখ রেহানা। অপরদিকে বেঁচে যান বাংলাদেশ আওয়ামী যুবলীগের প্রতিষ্ঠাতা চেয়ারম্যান ও বঙ্গবন্ধুর আপন ভাগিনা, মহান মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম সংগঠক, মুজিব বাহিনীর প্রধান শেখ ফজলুল হক মনি ও তার সহধর্মিণী আরজু মনি’র দুই শিশুপুত্র শেখ পরশ ও শেখ তাপস। তখন তাদের বয়স ছিল যথাক্রমে ৫ ও ৪ বছর। এই বয়সে তারা তাদের বাবা-মা’কে হত্যা হতে দেখেছেন যদিও তাদের মৃত্যু সম্পর্কে বিন্দুমাত্র ধারণা ছিল না। তারা যে তাদের বাবা-মা’কে আর কোনদিন ফেরত পাবে না, এমনটা বোঝার মতো জ্ঞান-বুদ্ধি তখনো তাদের সেদিন হয়নি। তাদেরকে যা বোঝানো হতো তখন তারা তাই বিশ্বাস করতেন। তাদের চাচা-চাচি’রা তাদেরকে সান্ত্বনা দিতেন তাদের বাবা-মা বাহিরে আছেন, পরে ফিরে আসবেন। এদিকে ঘাতকেরা তাদেরকে ধরার জন্য হন্য হয়ে খুঁজতে থাকেন, ফলে তাদেরকে একেক সময় একেক আত্মীয়ের বাসায় থাকতে হয়েছিল, কোথাও স্থায়ীভাবে থাকতে পারতেন না, সব সময় তাদের মনের মধ্যে একটা ভয় থাকতো যে, কখন যে তাদের ধরে নিয়ে যায়। কত কষ্টে যে তাদের প্রতিটি দিন পার হয়েছে তা ভাষায় প্রকাশ করার মত না।
পরশ-তাপসের শৈশবকাল আর দশটা শিশুর মত স্বাভাবিক ছিল না, জগতের সকল শিশুরা সামাজিকভাবে যেভাবে বেড়ে ওঠেন তাদের ক্ষেত্রে সেভাবে বেড়ে ওঠার সুযোগ হয়নি। যে বয়সে তাদের স্কুলে যাওয়ার কথা, স্কুলে গিয়ে সহপাঠীদের সাথে খেলাধুলা করার কথা, এসব কোন কিছুই শিশুকালে তাদের জীবনে আসেনি। তাদের স্বাধীনভাবে চলাফেরা করার মত সুযোগ ছিল না, ছিল না জানালা দিয়ে বাইরে তাকানোর কোন সুযোগ, বৃষ্টি আসলে বাসার বাইরে খোলা আকাশের নিচে অন্য সব শিশুদের মত বৃষ্টিতে ভেজার কোন ইচ্ছাই তাদের পূরণ হয়নি। শিশুকালের সমবয়সীদের সাথে বন্ধুত্বের বন্ধন কখনো গভীর হয়নি কারণ তাদের কখনো এক জায়গায় বেশিদিন থাকার সুযোগ হয়নি, প্রতিনিয়তঃ তাদেরকে থাকার জায়গা পরিবর্তন  করতে হয়েছে, ফলে তাদের প্রতিনিয়ত নতুনদের সাথে পরিচিত হতো আর পুরাতনদের কথা ভেবে তাদের আরও অনেক কষ্ট হতো, তবুও তাদেরকে সবকিছু মেনে নিয়ে জীবন পাড়ি দিতে হয়েছে। 
মনোবিজ্ঞানীদের মতে, ” শিশুদের ওপর মানসিক আঘাতের প্রভাব অনেক দীর্ঘস্থায়ী ও ক্ষতিকর। যেকোনো ধরনের অনাকাঙ্খিত ঘটনার প্রতিক্রিয়ায় মানসিক আঘাত শিশুর পরবর্তী জীবনকে বাধাগ্রস্ত করে, আবেগজাত সমস্যায় আক্রান্ত করে”
কিন্তু শেখ পরশ ও শেখ তাপসের জীবনে ঘটেছে উল্টোটা। তাদের সামনে অসংখ্য অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনা ঘটলেও তাদের বিকাশ বাধাগ্রস্থ হয়নি বরং জীবনের প্রতিটি ধাপ সফলতার সহিত অতিক্রম করেছেন। স্কুল কলেজের বন্ধুরা তাদের বাবা মা সম্পর্কে কটু কথা বললেও তারা বিচলিত হননি, থেমে থাকেননি বরং ভালো ফলাফল করেই স্কুল, কলেজ জীবন অতিক্রম করেছেন।।
শেখ পরশ দেশের সর্বোচ্চ বিদ্যাপীঠ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ইংরেজি সাহিত্যে অনার্স ও মাস্টার্স ডিগ্রী অর্জন করে দেশের বাইরে থেকে স্নাতকোত্তর ডিগ্রিও অর্জন করেন। বিদেশে থেকে বাকি জীবনটা পার করে দিতে পারতেন কিন্তু যে দেশকে স্বাধীনতা এনে দেওয়ার জন্য তাদের বাবা-মা সহ জাতির পিতার পরিবারকে নির্মমভাবে খুন করা হয়েছে, সেই দেশকে ছেড়ে থাকতে তার মন টেকেনি, আর তাইতো দেশে এসে সর্বোচ্চ সম্মানজনক পেশা শিক্ষকতায় যোগ দেন, পাশাপাশি সঙ্গীত চর্চাও করেন, সংগীতে তার ভালো দক্ষতাও আছে। অন্যদিকে রাজনীতি তার রক্তের সাথে মিশে আছে, সক্রিয় রাজনীতি না করলেও পারিবারিক কারণেই রাজনৈতিক সঠিক চিত্রটা অত্যন্ত কাছ থেকেই তার দেখার সুযোগ হয়েছিল শুধুমাত্র রাজনীতিতে আনুষ্ঠানিকতা বাকি ছিল। অবশেষে বঙ্গবন্ধু কন্যা দেশরত্ন শেখ হাসিনার নির্দেশে তারই বাবার হাতে গড়া সংগঠন, বাংলাদেশ আওয়ামী যুবলীগের সপ্তম কংগ্রেসে চেয়ারম্যান হিসেবে দায়িত্বভার গ্রহণ করতে হয়েছে।
দায়িত্ব যখন গ্রহণ করলেন, তখন যুবলীগের ক্রান্তিকাল চলছে। যুবলীগের কিছু বিপদগামী নেতা সর্বমহলে যুবলীগকে ক্যাসিনো লীগে পরিণত করেন। ফলে যুবলীগকে একটি পরিচ্ছন্ন ও সুসংগঠিত সংগঠন হিসেবে দাঁড় করানোর দায়িত্বভার তার কাঁধেই এসে পড়ল এবং তিনি একে চ্যালেঞ্জ হিসেবে গ্রহণও করলেন। এরপর যুবলীগকে নিয়ে তার যে ভিশন আছে তা সকলের সামনে তুলে ধরলেন।
প্রথমে একটি সুন্দর প্রক্রিয়ার মাধ্যমে পদ প্রত্যাশীদের জীবন বৃত্তান্ত গ্রহণ করলেন। বিগতদিনের লবিং ও বাণিজ্যের মাধ্যমে পদ প্রাপ্তির কালচার বন্ধ করে দিলেন। শুধুমাত্র সাংগঠনিক নেত্রী দেশরত্ন শেখ হাসিনা সঠিক নির্দেশনায় ও জীবনবৃত্তান্তের সত্যতার আলোকে কমিটি গঠন করলেন। কমিটিতে সকল পেশার লোকজনই পদ পেয়েছেন যাদের দীর্ঘ রাজনৈতিক অভিজ্ঞতা ও স্বচ্ছ ইমেজ ছিল। ছাত্রলীগের সাবেক ছাত্রনেতাদের মধ্যে যারা সংগঠনের ক্লান্তিকালে ও বিরোধী রাজপথে অগ্রণী ভূমিকা পালন করেছেন তাদেরকে স্থান দিয়েছেন। সর্বোপরি একটি যুগোপযোগী, পরিচ্ছন্ন ও সাংগঠনিকভাবে শক্তিশালী কমিটি উপহার দিয়েছেন যা সর্বমহলে প্রশংসিত হয়েছে।
অন্যদিকে সাংগঠনিক কার্যক্রমেও সফলতার পরিচয় দিয়েছেন। দায়িত্ব পাওয়ার পরপরই করোনায় বিপর্যস্ত তখন দেশ তখন অসহায় দুস্থ ও কর্মহীন মানুষের খাবারের ব্যবস্থা করেছেন, বাড়ি বাড়ি গিয়ে খাবার পৌঁছে দিয়েছেন, অনলাইনে স্বাস্থ্যসেবা দেওয়ার জন্য টেলিমেডিসিন সার্ভিস, ফ্রী এম্বুলেন্স সার্ভিস, করোনা রোগীর লাশ দাফন, চিকিৎসকদের চিকিৎসাসামগ্রী বিতরণ, কৃষকের ধান কেটে যুবলীগ সারাদেশে মানবিক যুবলীগে পরিণত হয়েছিলেন এবং পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষায় সারাদেশে বৃক্ষরোপণ করে যুবলীগ, প্রকৃতি-বান্ধব যুবলীগ হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেছেন। আজ যুবলীগকে আর কেউ ক্যাসিনো-লীগ বলে না, এখন বলে মানবিক যুবলীগ। দায়িত্ব গ্রহণের পর যুবলীগ এক বছর অতিক্রম করেছেন। আর এই একবছরে শেখ পরশ প্রমাণ করেছেন তিনি রাজনীতিতেও সফল। 
অপরদিকে শেখ তাপস, ইংলিশ মিডিয়ামে ‘এ’ & ‘ও’ লেভেল শেষ করে  লন্ডন থেকে “বার-এ্যাট’ল”(ব্যারিষ্টার) ডিগ্রী প্রাপ্ত হন  এবং শেখ পরশের আগেই রাজনীতিতে নাম লিখিয়ে ঢাকা-১০ থেকে পরপর তিনবার সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়েছিলেন। সংসদ সদস্য হিসেবে তিনি সফল হয়েছিলেন এবং সততা, নিষ্ঠা ও পরিচ্ছন্নতার মাধ্যমে রাজনীতিতে একটি শক্ত অবস্থান তৈরি করে নিয়েছেন। সর্বোপরি মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর শুদ্ধি অভিযানকে সফল করার লক্ষ্যে সর্বপ্রথম তিনিই সোচ্চার হয়েছিলেন, ফলে শুদ্ধি অভিযান সফলতার মুখ দেখেন এবং মাননীয় প্রধানমন্ত্রী’র পাশাপাশি সর্বমহলে শেখ তাপসও প্রশংসিত হন। যার ফলশ্রুতিতে ঢাকা দক্ষিণ সিটি কর্পোরেশন নির্বাচনে শেখ তাপসকে আওয়ামী লীগ থেকে মনোনয়ন দেওয়া হয় এবং তিনি বিপুল ভোটে বিজয়ী হন। তাপস দায়িত্ব গ্রহণের পর থেকেই দীর্ঘদিনের কিছু অমিমাংসিত ইস্যু সমাধান করেছেন। অতিতের মেয়ররা যে কাজগুলো করতে ভয় পেতেন বা যে কাজগেুলো করতে পারতেন না সেগুলো নিমিষেই করে ফেলছেন শেখ ফজলে নুর তাপস। বিভিন্ন বিভাগের মধ্যে সমন্বয়হীনতার কারণে ঢাকা সিটিতে সারাবছরই রাস্তা খোঁড়াখুঁড়ি চলত। এখন সব বিভাগ একই পরিকল্পনার অধীনে একত্রিত হয়ে কাজ করবেন বলে নগরবাসীর দুর্ভোগ কমে যাবে। ওয়াসার ব্যর্থতার কারণেই এতো দিন ঢাকা মহানগর জলবাদ্ধতা সমস্যায় ভুকছিল। এখন পয়নিস্কাশনের ক্ষমতা ওয়াসার কাছ থেকে সরিয়ে সিটি কর্পোরেশনকে দেয়ার ব্যবস্থা হচ্ছে, ফলে নগরবাসী জলাবদ্ধতার হাত থেকে রক্ষা পাবেন। তিনি ভিশন’২১ ও রুপকল্প’৪১ অনুযায়ী দীর্ঘমেয়াদী পরিকল্পনা গ্রহণ করছেন যার ফলে তিনি অচিরেই ডিএসসিসি’কে একটি সচল ও আধুনিক সিটিতে রূপান্তরিত করতে যে সক্ষম হবেন, সে বিষয়ে সন্দেহের কোনো অবকাশ নেই। এখন পর্যন্ত তিনি সফলভাবে দায়িত্ব পালন করে যাচ্ছেন এবং নগরবাসী এ পর্যন্ত তার সকল পদক্ষেপ ও ভবিষ্যৎ পরিকল্পনায় সন্তুষ্ট।
পরিশেষে বলতে চাই, ঘাতকেরা শেখ পরশ ও শেখ তাপসের শৈশব কেড়ে নিলেও তাদেরকে আলোকিত হওয়া থেকে বিরত রাখতে পারেননি। শৈশবে বাবা-মা’কে হারিয়ে অত্যন্ত কষ্ট ও মানসিক যন্ত্রণা নিয়ে জীবন সংগ্রামে অনেকেই হারিয়ে গেলেও তারা আজকে উভয়েই স্ব-স্ব ক্ষেত্রে আলোকিত। তারা আরাম আয়েশের মধ্যে নিজেদের জীবনকে সীমাবদ্ধ করেননি, তারা তাদের অর্জিত জ্ঞান ও মেধাকে দেশের কাজে লাগানোর জন্য সর্বদা নিয়োজিত রেখেছেন। সন্ত্রাস, দুর্নীতি, জঙ্গিবাদ ও মাদকমুক্ত বাংলাদেশ গঠনের জন্য মাননীয় প্রধানমন্ত্রী দেশরত্ন শেখ হাসিনা যে চ্যালেঞ্জ গ্রহণ করেছেন, তা বাস্তবে রূপ দিতে জীবনের ঝুঁকি নিয়ে সকল অপশক্তির বিরুদ্ধে লড়াই করে যাচ্ছেন। বঙ্গবন্ধু কন্যার নেতৃত্বে আপনারা এ লড়াইয়ে অবশ্যই জয়ী হবেন। পরশ-তাপস ভয় নাই, আমরা আছি লাখো ভাই। আপনাদের জন্য আমাদের শুভ কামনা থাকবে, সব সময়ের জন্য। জয় বাংলা, জয় বঙ্গবন্ধু।।
লেখক: সফিউল আলম প্রধান কমলসদস্য, বাংলাদেশ আওয়ামী যুবলীগ,কেন্দ্রীয় কমিটি।।