April 15, 2021

Jagobahe24.com news portal

Real time news update

পঞ্চগড়ের দৃষ্টি প্রতিবন্ধী দুই ভাই, পড়েন ঢাবি-জাবিতে

পঞ্চগড়ের দৃষ্টি প্রতিবন্ধী দুই ভাই, পড়েন ঢাবি-জাবিতে

পঞ্চগড়ের দৃষ্টি প্রতিবন্ধী দুই ভাই, পড়েন ঢাবি-জাবিতে

জসিম উদ্দীন ইতি পঞ্চগড় ঘুরে, ঠাকুরগাঁও প্রতিনিধিঃ
সেলিম ইসলাম (২২) ও রাইসুল ইসলাম (২০)। শৈশবেই দৃষ্টিশক্তি হারিয়েও দমে যাননি দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী দুই ভাই। অদম্য ইচ্ছা শক্তি আর দৃঢ় মনোবলের কারণে দুই ভাইই এখন বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী।
সেলিম জাহাঙ্গীর নগর বিশ্ববিদ্যালয়ে ইতিহাস বিভাগে আর রাইসুল ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে সমাজ বিজ্ঞান বিভাগে পড়ছেন। দুজনেই ২০১৮-১৯ শিক্ষা বর্ষের শিক্ষার্থী। দরিদ্র পরিবারের এই দুই ভাই ভবিষ্যতে বিসিএস ক্যাডার হয়ে শিক্ষক হতে চান। দায়িত্ব নিতে চান পরিবারে অভাবের সংসারের।
সেলিম ও রাইসুলের বাড়ি পঞ্চগড়ের আটোয়ারী উপজেলার মির্জাপুর গ্রামে। বাবা শহিদুল ইসলাম পেশায় রং মিস্ত্রি। পাঁচ ভাই-বোনের মধ্যে দ্বিতীয় সেলিম ও তৃতীয় রাইসুল। সেলিম তৃতীয় শ্রেণিতে আর রাইসুল প্রথম শ্রেণিতে পড়াকালীন দৃষ্টিশক্তি হারান।
কথা হয় সেলিম ও রাইসুলের। তারা জানান, দৃষ্টিশক্তি হারিয়ে ঘরবন্দি ছিলেন এক বছর। পড়ালেখা থেকে দুরে থেকে ভালো লাগছিলো না তাদের। পরে পরিচিতজনের মাধ্যমে পঞ্চগড় সমন্বিত দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী শিক্ষা কার্যক্রমে যোগাযোগ করেন। আবার পড়াশোনা শুরু হয়। পরবর্তীতে পঞ্চগড়ের কমলাপুর দ্বি-মুখী উচ্চ বিদ্যালয় থেকে ২০১৩ সালে জেএসসি ও ২০১৬ সালে এসএসসি এবং ঢাকা কলেজ থেকে ২০১৮ সালে এইচএসসি পাশ করেন। এসএসসি ও এইচএসসিতে দুজনেরই রেজাল্ট ছিলো জিপিএ- ৫।
তবে এই অর্জন মোটেও সহজ ছিলো না। পারি দিতে হয়েছে অনেক চড়াই উতরাই। বঞ্চিত ছিলেন সরকারি সুযোগ সুবিধা থেকেও।
তারা জানান, বন্ধুদের কাছে পাঠ্যবইয়ের পড়া রেকর্ড করে নিতে হতো তাদের। পরে সেগুলো শুনে শুনে মুখস্থ করে শ্রুতিলিখন পদ্ধতিতে পরীক্ষা দিতেন।
বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াকালীন কোন প্রতিবন্ধকতা দেখা দেয় কি-না এমন প্রশ্নে তারা জানান, মূল প্রতিবন্ধকতা হলো হল থেকে ক্লাসে যেতে হলে রিকশা অথবা বন্ধুদের সহযোগিতা নিতে হয়। অনেক সময় রিকশা এবং বন্ধু কাউকেই না পেলে ক্লাসে যাওয়া হয় না। আর পরীক্ষার সময় শ্রুতিলেখক পাওয়া যায় না। এছাড়া দরিদ্র পরিবারের হওয়ায় অর্থনৈতিক সমস্যাতো রয়েছেই। অনেক কষ্ট করে চলতে হয়।
বলেন,আমরা অতিরিক্ত কোন সুযোগ সুবিধা পাইনা। অন্যান্য জিপিএ- ৫ প্রাপ্তরা যেমন সুবিধা পায় আমাদেরও তেমনি। এদিয়েই চালিয়ে নিতে হয় আমাদের।
কোভিড-১৯ পরিস্থিতিতে ক্যাম্পাস বন্ধ থাকায় প্রায় এক বছর ধরে বাবা-মার সাথে মির্জাপুর গ্রামে অবস্থান করছেন সেলিম-রাইসুল। এ নিয়েও হতাশা প্রকাশ করেন তারা। বরং নানান সমস্যার সম্মুখীন হচ্ছেন। পিছিয়ে যাচ্ছেন লেখা পড়াতেও।
তারা বলছেন, সময় থেমে নেই অথচ ক্যাম্পাস বন্ধ থাকায় অনেক পরীক্ষা আটকে রয়েছে। কবে এগুলোর সমাধান হবে এমন প্রশ্ন মাথায় ঘুরপাক খাচ্ছে। আর এখন অনলাইনে ক্লাস করতে হচ্ছে। অনেক সময় ক্লাস বুঝিনা, গ্রামে নেটওয়ার্ক সংযোগ দুর্বল থাকে এতে অনেক ক্লাস করা যায় না।
সেলিম বলেন,যেখানে সবকিছুই স্বাভাবিক মত চলছে সেখানে শিক্ষা প্রতিষ্ঠান বন্ধ রাখার যৌক্তিকতা জানা নেই।
সমাজে অনেক দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী রয়েছে যারা লেখাপড়া করতে পারেনা তাদের প্রতি আপনাদের বক্তব্য কি? এমন প্রশ্নে রাইসুল বলেন, আসলে ছোট বেলায় এদেরকে ভালো করবে এমন সাপোর্ট দেওয়া হয় না। যেহেতু ছোট বেলায় কেউ নিজে থেকে কিছু বুঝে না। সে ক্ষেত্রে পরিবার ও সমাজের সাপোর্ট বেশি গুরুত্বপূর্ণ। আমাদের মতো যারা রয়েছে তাদেরকে যদি বাবা-মা, আত্মীয়-স্বজনসহ আশপাশের লোকজন উৎসাহ দেয় তাহলেই সম্ভব।
রাইসুল বলেন, আমাদের চলার পথ মসৃণ নয়। পুরো পথই প্রতিবন্ধকতায় ভরপুর। তোমরা লেখাপড়া করে কি করবা, কতটুকু সফল হবা- এমন কথাও শুনতে হয়েছে। তবে এখন সবদিক থেকে সাপোর্ট পাচ্ছি, যেটা শুরুতে পাইনি। আমাদের সবচেয়ে বড় সাপোর্ট আমাদের বাবা-মা।
সেলিম-রাইসুলের বাবা শহিদুল ইসলাম বলেন,অনেক কষ্টে সংসার চলে। আমার একার উপার্জনে চার সন্তানের লেখাপড়ার খরচ যোগাতে হয়। অনেক সময় হিমশিম খেতে হয় আমাকে। এভাবেই সেলিম-রাইসুল এ পর্যন্ত এসেছে। যদি কোন সরকারি-বেসরকারি সহযোগিতা পাওয়া যেতো তাহলে আমার জন্য সহজ হতো।