April 19, 2021

Jagobahe24.com news portal

Real time news update

মুক্তিযুদ্ধে পার্বতীপুুর এবং একজন মুক্তিযোদ্ধা

মুক্তিযুদ্ধে পার্বতীপুুর এবং একজন মুক্তিযোদ্ধা

মুক্তিযুদ্ধে পার্বতীপুুর এবং একজন মুক্তিযোদ্ধা

আল মামুন মিলন, পার্বতীপুর(দিনাজপুর)প্রতিনিধি
১৯৭১ সালের মহান স্বাধীনতা যুদ্ধ চলাকালিন পাক হানাদার বাহীনির বিরুদ্ধে লড়াই সংগ্রামে বড় ভুমিকা রেখেছিলেন
পার্বতীপুরের অংশগ্রহনকারী মুক্তিযোদ্ধারা। মুলতঃ দিনাজপুর জেলার অন্তভুক্ত রেলওয়ের চার লাইনের জংশন স্টেশন পার্বতীপুর শহর ছিল বিহারী অধ্যশিত। শহরে বিহারী ও বাংঙ্গালীদের মধ্যে বিরোধ লেগেই থাকত। মহান মুুক্তিযুদ্ধে নতুন মাত্রা যোগ করে। বিহারী আধ্যশিত হওয়ার সুবাদে মুক্তিযুদ্ধ চলাকালীন পাক হানাদার বাহীনির ঘাটি নির্মান ও আশ্রয় প্রশ্রয়ে সহযোগীতা করেছিলেন তারা। স্থানীয় রাজাকার ও পাকিস্থানীদের দোসররা নানাভাবে ইন্ধন যোগিয়েছিল তাদের।
শহরের বিহারী বিল্ডিং( বর্তমান কৃষি ব্যাংক ও পৌর ভবন) হাবড়া ও ভবানীপুর পশ্চিম কো-অপারেটিভ মিলে খান সেনাদের প্রধান ঘাটি ছিল বলে জানা যায়। এ সময় পাকিস্থানী বাহিনীর জ্বালাও পোড়াও খুন গনহত্যা নির্যাতন নারী ধর্ষন চলত প্রতিদিন। শহরের চারপাশে ৫/৭ মাইল এলাকা জুড়ে বাচ্চু খানের বাহিনী চালিয়েছিল তান্ডব । বিশেষ করে পাক বাহিনীর সাথে মুক্তিযোদ্ধাদের সংঘঠিত বেলাইচন্ডী, খোলাহাটি,হাবড়া ও বেজাই মোড়ের যুদ্ধ স্বরনীয় হয়ে থাকবে। এর মধ্যে হাবড়ার যুদ্ধ ছিল খুবই ভয়ানক।অবশেষে মুক্তিযোদ্ধা ও মুক্তিকামী জনতার প্রবল প্রতিরোধের মুখে ১৫ ডিসেম্বর পার্বতীপুর হানাদার মুক্ত করা হয়। পাক হানাদার বাহীনির নির্মম নির্যাতনে শহীদদের স্বরনে রেলওয়ে স্টেশনের উত্তরে রেলবস্তির নিকট ও খোলাহাটিতে বদ্ধভুমি নির্মান করা হয়েছে।
মহান মুক্তিযুদ্ধে অংশ নেয়া তেমন একজন বীর মুক্তিযোদ্ধা মোঃ তহমিদুর রহমান কারী (৬৫)। পিতা মৃত্যু আঃ কাইয়ুম। মাতার নাম আয়মনা খাতুন। তিনি ১৯৫৭ সালের ১২ সেপ্টেম্বর উপজেলার পলাশবাড়ি ইউনিয়নের কালিকাপুর গ্রামে জন্মগ্রহন করেন।বর্তমানে হাবড়া ইউনিয়নের ভবানীপুর বাজারে নিজ বাড়ীতে বসবাস করছেন তিনি। ভারতে গেরিলা যুদ্ধ প্রশিক্ষন নিয়েছিলেন তিনি। অপারেশন টার্গেট ছিল পার্বতীপুর- ভবানীপুর। যুদ্ধ করেছেন পার্বতীপুর –বদরগন্জ এ্যারিয়ায়। গ্রুফ কমান্ডার আজাহারুল ইসলামের নেতৃত্বে ১৩ জনের একটি সুসংগঠিত বাহিনী ছিল তাদের । মুক্তিযুদ্ধের কথা তুলে ধরে মহান স্বাধীনতা যুদ্ধে অংশ নেয়া এই বীর মুক্তিযোদ্ধার সাথে আলাপচারিতায় পার্বতীপুরের মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসের নানা অজানা তথ্য জানা যায়। মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতিচারন করতে গিয়ে এসময় তিনি আবেগ আপ্লুত হয়ে পড়েন । মুক্তিযুদ্ধের সময়কে ইতিহাসের ¯্রষ্টে সময় আখ্যা দিয়ে ২য় সম্মুখ যুদ্ধের কথা তুলে ধরেন তিনি। ১৯৭১ অক্টোবর মাস ৪/৫ টি গ্রুপ সমন্বয় করে সুলতানপুর পাটিকাঘাট দলাইকোটা আনন্দবাজার সহ নাগের হাট লোহানিপাড়া এলাকায় অপারেশন এর কাজ চলছিল। বিশেষ করে ওই সময় রেল লাইনে পাহারারত রাজাকারদের লক্ষ্য করে অপারেশন চালানো হত। প্রতিদিনই সেন্টার পরিবর্তন করা হত। ওই দিন বদরগন্জের ওসমানপুর মহুদিপুর এলাকা থেকে ৩ জন রাজাকারকে ধাওয়া করলে অস্ত্র সহ তারা আক্রমন চালায় । গোলাগুলির একপর্যায়ে ৩ জনই মুক্তিযোদ্ধাদের গুলিতে মারা যায়। রাতে পাটিকাঘাটে অবস্থানকালে ভবানীপুর থেকে খান সেনারা ও পার্বতীপুর ক্যাম্প থেকে বাচ্চু খানের দল মুক্তিযোদ্ধাদের ঘেরাও করে। সেই দিন শুকদেবপুর সস্তাপুর ললশিশা গ্রাম থেকে শতাধীক নারী পুরুষকে ধরে এনে নির্যাতন চালিয়ে হাত পা বেধে ফেলে রাখেছিল খান সেনারা। খবর পেয়ে নলশিশা নদীর উপর ঢেড়ের হাটে অবস্থান নিয়ে যুদ্ধের প্রস্তুতি চলতে থাকে। আজাহারুল গ্রুপের সাথে আফজাল ভাই আলাউদ্দিন তোজাম্মেল আবু বক্কর সিদ্দিক সহ ৫/৬ টি গ্রুপ মিলে তখন ৫০ থেকে ৬০ জন মুক্তিযোদ্ধা। তোজাম্মেল ভাই এর হাতে ছিল এল এমজি। এ যুদ্ধে তিনি নিজে এস এম জি চালনার কথা বলেন। এদিকে শত্রু বহর তখন পজিশন এরিয়ার কাছাকাছি। আক্রমন , নাকি পিছু হটবে এসময় সিন্ধান্তে পৌছতে পারছিল না মুক্তিযোদ্ধারা। তখন ভোর রাত, কিন্তু শত্রুরা ততক্ষনে ঘিরে ফেলেছে তাদের আর কোন অবকাশ। নেই ফায়ার বলার সংগে সংগে এল এমজি, এস এমজি এক সংগে গর্জে উঠল । চারিদিকে মুহু মুহু গুলি চালিয়ে শত্রুর দিকে এগুতে তাকে মুক্তিযোদ্ধারা। এ সময় খান সেনারা প্রতিরোধের মুখে পিছু হটতে বাধ্য হয়। প্রানে বেচে যাওয়া হাত পা বাধা অবস্থায় ফেলে রাখা নারী পুরু কে উদ্ধার করে বাড়িতে ৗেছে দেয়া হয়। এদের মধ্যে আব্দুর রহমান কালাম পরবর্তীতে হামিদপুর(ইউপি চেয়ারম্যান) ছিলেন। সেইদিন তিনিও ঁেবচে যান। ওই দিন বিকেলে ভারী গোলাবারুদ ও অ¯ত্র সস্ত্র নিয়ে পিছু হটা পাক সেনারা পুনরায় ভবানীপুর থেকে অগ্রসর হওয়ার চেষ্টা চালালে মুক্তিযোদ্ধারা প্রবল প্রতিরোধ গড়ে তোলে। সেই দিন ঘুঘুমারিতে খান সেনাদের গুলিতে গোলাপ চাচা নামে এক বাঙ্গালী শহীদ হন।
এছাড়াও খোলাহাটির সম্মুখ যুদ্ধের কথা তুলে ধরেন তিনি। নভেম্বর মাসের শেষ দিক। এসময় মুক্তিযোদ্ধাদের ৮/১০ টি গ্রুফ বিভক্ত হয়ে দুর্গাপুর কালিকাপুর শাকোয়াপাড়া শাইলবাড়ি ও আটরাই এলাকায় অবস্থান করছিল। নিয়মিত জ্বালাও পোড়াও এর অংশ হিসেবে হানাদার বাহীনির একটি দল পার্বতীপুর শহর থেকে ট্রেনে করে খোলাহাটি এলাকায় পৌছে। খোলাহাটির গড়ের পাড়ে ট্রেন থামিয়ে তারা গ্রামের পর গ্রাম জ্বালাও পোড়াও তান্ডব চালাচ্ছিল। আজাহারুল গ্রুপ সহ মুক্তিযোদ্ধাদের ৫/৬ টি গ্রুপ একত্রিত হয়ে ওই দিন প্রতিরোধ গড়ে তোলেন। চলতে থাকে দুই পক্ষের গোলাগুলি। এক পর্যায়ে হানাদার বাহীনি পিছু হটতে থাকে। পালিয়ে তারা শহরের ক্যাম্পে আশ্রয় নেন। ওই যুদ্ধে অংশ নেয়া আলাউদ্দিন, আবু বক্কর সিদ্দিক, কালাম, মুসা ও মংলু সহ বেশ কয়েকজন মুক্তিযোদ্ধা কমান্ডার ও সহকর্মীর কথা জানান তিনি।