October 27, 2021

Jagobahe24.com

সত্যের সাথে আপোসহীন

সিনহা হত্যা: যতদূর এগোলো বিচারকাজ

সিনহা হত্যা: যতদূর এগোলো বিচারকাজ

সিনহা হত্যা: যতদূর এগোলো বিচারকাজ

করোনার দ্বিতীয় ঢেউ মোকাবিলায় সারাদেশে চলছে সর্বাত্মক লকডাউন। বন্ধ রয়েছে অফিস-আদালত। আর আদালত বন্ধ থাকায় কিছুটা স্থবির হয়ে পড়েছে অবসরপ্রাপ্ত মেজর সিনহা মোহাম্মদ রাশেদ খান হত্যা মামলার বিচারকাজ। তবে এ মামলার অন্যান্য কাজ এগিয়ে রয়েছে।

সিনহা হত্যা মামলায় মোট অভিযুক্ত ১৫ জন। এর মধ্যে কারাগারে রয়েছেন টেকনাফ থানার সাবেক ওসি প্রদীপ কুমার দাশসহ ১৪ জন। তবে এখনো একজন পলাতক রয়েছেন।

বিচারিক আদালতে আলোচিত এ মামলার দিন ধার্য ছিল গত ৮ এপ্রিল। কিন্তু করোনার সংক্রমণ বাড়ায় সরকারের বিধিনিষেধ থাকায় সেদিন আর কার্যক্রম চলেনি। আদালত খুললেই শুরু হবে এ মামলার কাজ।

এরই মধ্যে ম্যাজিস্ট্রেট কোর্ট থেকে মামলার সব নথিপত্র কক্সবাজার জেলা জজ আদালতে পৌঁছেছে। পাবলিক প্রসিকিউটর জানান, করোনার কারণে বন্ধ থাকায় আদালতে নথিপত্র উপস্থাপন হয়নি। মামলায় অভিযুক্ত পুলিশ সদস্যরা আদালতে জামিন চেয়ে আবেদন করেছিলেন। তবে তা নামঞ্জুর করেছে আদালত।

২০২০ সালের ৩১ জুলাই কক্সবাজার-টেকনাফ মেরিন ড্রাইভ সড়কে পুলিশের গুলিতে নিহত হন অবসরপ্রাপ্ত মেজর সিনহা মোহাম্মদ রাশেদ খান। এ হত্যাকাণ্ড দেশজুড়ে ব্যাপক আলোড়ন সৃষ্টি করে। ফলে সিনহা হত্যা মামলা গুরুত্বের সঙ্গে দ্রুত তদন্ত ও অভিযোগপত্র দায়েরের মাধ্যমে তা বিচারিক পর্যায়ে চলে যায়।

সিনহার বোনের করা মামলার আইনজীবী মোহাম্মদ মোস্তফা বলেন, করোনায় আদালতের স্বাভাবিক কার্যক্রম বন্ধ থাকায় থেমে আছে সিনহা হত্যা মামলার কার্যক্রম। এছাড়া আর কোনো বাধা নেই। আদালত চালু হলে কার্যক্রম ফের শুরু হবে।

ঘটনার দিন নিহত সিনহার গাড়ি থেকে কিছু ইয়াবা, গাঁজা ও মদ উদ্ধারের কথা জানায় পুলিশ। করা হয় একাধিক মামলা। কিন্তু ঘটনার পরদিনই পাল্টাতে থাকে পরিস্থিতি। সিনহা হত্যার খবর গণমাধ্যমে ফলাও করে প্রচার করা হয়।

ওই বছরের ৫ আগস্ট এ ঘটনায় নয়জন পুলিশ সদস্যকে অভিযুক্ত করে আদালতে একটি হত্যা মামলা করেন সিনহার বোন শারমিন শাহরিয়ার। আদালত মামলাটি আমলে নেয় এবং টেকনাফ থানাকে মামলাটি নেয়ার জন্য নির্দেশ দেয়। আসামিরা আদালতে দ্রুত আত্মসমর্পণ করেন। এ হত্যাকাণ্ডের চার মাস দশদিন পর কক্সবাজার আদালতে ২৬ পৃষ্ঠার অভিযোগপত্র জমা দেয় মামলার তদন্ততের দায়িত্ব পাওয়া র‌্যাব। চার্জশিটে সিনহা হত্যার ঘটনাটি ‘পরিকল্পিতভাবে হত্যা’ বলে উল্লেখ করেন র‍্যাবের তদন্ত কর্মকর্তা সিনিয়র সহকারী পুলিশ সুপার খায়রুল ইসলাম।

গত ৮ এপ্রিল এ মামলার দিন ধার্য ছিল বলে জানিয়েছেন সিনহার বোনের আইনজীবী মোহাম্মদ মোস্তফা। তিনি বলেন, মামলায় একজন আসামি পলাতক রয়েছেন। আর বাকি আসামিরা রয়েছেন কারাগারে। পলাতক আসামির বিচারের জন্য যেসব নিয়ম আছে, যেমন- ওয়ারেন্ট, পেপার পাবলিশড- এসব শেষ হয়েছে। দেড় সপ্তাহ আগে ফাইল ট্রান্সফার হয়ে জজকোর্টে গেছে। সেখানে নরমাল যে ট্রায়াল প্রসিডিউর আছে, সেভাবে বিচারকাজ শুরু হবে।

কোনো পলাতক আসামির বিচার চালাতে হলে আদালত থেকে সমন জারি করা হয়। এতেও আসামি হাজির না হলে হুলিয়া জারি, জাতীয় দৈনিকে বিজ্ঞপ্তি দেয়া হয়। এরপরও আসামি হাজির না হলে তার অনুপস্থিতিতে বিচারকাজ শুরু হয়। সিনহা হত্যা মামলায় পলাতক রয়েছেন পুলিশের কনস্টেবল সাগর দেব। তার অনুপস্থিতিতে এখন বিচার শুরু করতে আইনগত আর বাধা নেই বলে জানান আইনজীবী।

মামলাটি বিচারের জন্য ম্যাজিস্ট্রেট কোর্ট থেকে ফাইলপত্র জজকোর্টে এসেছে বলে জানিয়েছেন পিপি ফরিদুল আলম। তিনি বলেন, ফাইলপত্র জজকোর্টে এলেও আদালতে উপস্থাপন করা হয়নি। করোনায় আদালত বন্ধের কারণে এখনো কিছু করা যায়নি। আসামিপক্ষ বেশ কয়েকবার জামিন চেয়েছেন। তবে চাঞ্চল্যকর এ হত্যা মামলায় আসামিদের জামিন দেননি আদালত।

পুলিশসহ মোট অভিযুক্ত ১৫ জন

সিনহা হত্যা মামলার তদন্ত শেষে গত বছরের ১৩ ডিসেম্বর আদালতে প্রতিবেদন জমা দেয় র‌্যাব। এতে মোট ১৫ জনকে অভিযুক্ত করা হয়। এর মধ্যে নয়জন টেকনাফ থানার বরখাস্ত হওয়া পুলিশ সদস্য, তিনজন এপিবিএনের সদস্য এবং তিনজন বেসামরিক ব্যক্তি। এর মধ্যে পুলিশের কনস্টেবল সাগর দেব পলাতক। আর হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে জড়িত অভিযোগে গ্রেফতার ১৪ জনই রয়েছেন কারাগারে।

গ্রেফতারদের মধ্যে ১২ জন নিজের দোষ স্বীকার করে আদালতের কাছে ক্ষমা চেয়েছেন বলে অভিযোগপত্রে বলা হয়েছে। শুধু ওসি প্রদীপ এবং কনস্টেবল রুবেল শর্মা আদালতে জবানবন্দি দেননি।

র‌্যাবের তদন্তকারী কর্মকর্তা ৮৩ জন সাক্ষীর সাক্ষ্য নেন। বিভিন্ন ধরনের আলামত ও ডিজিটাল কন্টেন্ট আমলে এনে হত্যাকাণ্ডের মামলায় অভিযোগপত্র দেন তিনি।

এ মামলায় কারাগারে আছেন যারা

অবসরপ্রাপ্ত মেজর সিনহা মোহাম্মদ রাশেদ খান হত্যার ঘটনায় ১৪ জন কারাগারে রয়েছেন। তারা হলেন- টেকনাফ থানার সাবেক ওসি প্রদীপ কুমার দাশ, তার দেহরক্ষী রুবেল শর্মা, বাহারছড়া পুলিশ ফাঁড়ির তৎকালীন ইনচার্জ লিয়াকত আলী, টেকনাফ থানার এসআই নন্দদুলাল রক্ষিত, কনস্টেবল সাফানুর করিম, কামাল হোসেন, আব্দুল্লাহ আল মামুন, এএসআই লিটন মিয়া, এপিবিএনের এসআই মো. শাহজাহান, কনস্টেবল মো. রাজীব ও মো. আবদুল্লাহ, পুলিশের মামলার সাক্ষী টেকনাফের বাহারছড়া ইউনিয়নের মারিশবুনিয়া গ্রামের নুরুল আমিন, মো. নিজামুদ্দিন ও আয়াজ উদ্দিন।

তদন্তে যা বের হয়

গত বছরের ৭ জুলাই নীলিমা রিসোর্টে অবস্থান করেন সিনহা মোহাম্মদ রাশেদ খান, শিপ্রা দেবনাথ, সিফাত ও রুফতি। ইউটিউবে একটি ভিডিও চ্যানেল নিয়ে কাজ করার সময় স্থানীয় বাসিন্দাদের সঙ্গে তাদের সখ্যতা হয়। এরই সুবাদে তারা অবসরপ্রাপ্ত মেজর সিনহাকে সাবেক ওসি প্রদীপ কুমারের অত্যাচার-নির্যাতনের কথা জানান। এসব শুনে পীড়িত হন সিনহা।

তদন্তে আরো বেরিয়ে আসে, কক্সবাজারের টেকনাফ থানার সাবেক ওসি প্রদীপের কথিত রাজ্য ছিল। মূলত তার স্বেচ্ছাচারিতা, আইন অমান্য করে নিজস্ব দৃষ্টিভঙ্গি প্রতিষ্ঠা এবং তার অবৈধ ব্যবসা-বাণিজ্যের জন্য হুমকি হয়ে দাঁড়িয়েছিলেন সিনহা ও তার সঙ্গীরা। সরকারি অস্ত্রের অপব্যবহার করতেন ওসি প্রদীপ। এছাড়া ইয়াবাকেন্দ্রিক বাণিজ্যের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন বলেও জানা যায়।

এসব বিষয়ে ওসি প্রদীপের কাছে জানতে ক্যামেরা ও ডিভাইস নিয়ে থানায় যান সিনহা, শিপ্রা ও সিফাত। র‌্যাবের অভিযোগপত্রে বলা হয়, থানায় তাদের অনতিবিলম্বে টেকনাফ বা কক্সবাজার ছেড়ে যেতে বলা হয়। তা না হলে ‘তোমাদের আমি ধ্বংস করে দেব’ বলে হুমকি দেন প্রদীপ। ওসি প্রদীপের হুমকি উপেক্ষা করে কাজ চালিয়ে যাওয়ার কারণেই ষড়যন্ত্র করে সিনহাকে হত্যা করা হয় বলে জানায় র‌্যাব।

ঘটনার দিন সকাল থেকেই সিনহার গতিবিধি নজরে রাখা হয়। একটি আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর ‘বৃক্ষরোপণ’ অনুষ্ঠান শেষে ওসি প্রদীপকে জানানো হয়, প্রাইভেটকার নিয়ে টেকনাফের শামলাপুর পাহাড়ে গেছেন মেজর সিনহা রাশেদ। এ সময় সোর্সের মাধ্যমে বাহারছড়া ক্যাম্পের ইনচার্জ ইন্সপেক্টর লিয়াকত আলী সিনহার প্রতি নজর রাখতে থাকেন। শামলাপুর এপিবিএন পুলিশের চেকপোস্টে তল্লাশির নামে গাড়ি থেকে নামিয়ে অবসরপ্রাপ্ত মেজর সিনহা মোহাম্মদ রাশেদ খানকে খুব কাছ থেকে চারটি গুলি করেন ইন্সপেক্টর লিয়াকত আলী।

এর কিছুক্ষণ পরেই ঘটনাস্থলে যান প্রদীপ কুমার দাশ। তখনো জীবিত ছিলেন সিনহা। এ সময় সিনহার ‘মুখমণ্ডল ও শরীরের বিভিন্ন জায়গায় পায়ের জুতা দিয়ে আঘাত করে’ বিকৃত করার চেষ্টা করেন প্রদীপ কুমার দাশ। এরপরই অবসরপ্রাপ্ত মেজর সিনহা মারা যান।