December 1, 2021

Jagobahe24.com

সত্যের সাথে আপোসহীন

শ্রেণিকক্ষসহ বিদ্যালয়ের সবকিছুই রঙিন প্রচ্ছদে ঢাকা, হরিপুর উপজেলার অন্যতম একটি বিদ্যালয়

শ্রেণিকক্ষসহ বিদ্যালয়ের সবকিছুই রঙিন প্রচ্ছদে ঢাকা, হরিপুর উপজেলার অন্যতম একটি বিদ্যালয়

শ্রেণিকক্ষসহ বিদ্যালয়ের সবকিছুই রঙিন প্রচ্ছদে ঢাকা, হরিপুর উপজেলার অন্যতম একটি বিদ্যালয়


জসিম উদ্দিন ইতি ঠাকুরগাঁও প্রতিনিধিঃ
বাংলাদেশে এমন দৃষ্টিনন্দন বিদ্যাপিঠ কমই আছে। যেখানে রয়েছে প্রকৃতির কাছ
থেকে বিদ্যা লাভ করার সুযোগ। যেখানে ব্যতিক্রম পরিবেশে শিক্ষাদান করা হয়।
ব্যতিক্রম সেই বিদ্যাপিঠের নাম চরভিটা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়। এখানে
ছাত্র-ছাত্রীদের আধুনিক সৃজনশীল পদ্ধতিতে পাঠদান করা হয়।
ঠাকুরগাঁওয়ে অসাধারণ স্থাপনায় নির্মিত বিদ্যালয় ভবনের চারপাশ খোলামেলা।
শ্রেণিকক্ষসহ বিদ্যালয়ের সবকিছুই রঙিন প্রচ্ছদে ঢাকা। ছেলে মেয়েদের জন্য
আছে একাধিক আলাদা আলাদা ওয়াশরুম। শিক্ষার্থীদের খেলাধুলার জন্য রয়েছে
নানা সরঞ্জাম।
চারদিকে সবুজের সমারোহ। বাতাসে গাছের পাতা দোলে। দেখে মনে শিহরণ জাগে।
প্রত্যন্ত অঞ্চলের একটি গ্রাম, নাম চরভিটা। সেখানেই ব্যতিক্রমী এ স্কুল।
দেখে মনে হয় না, এটি বিদ্যাপিঠ। কোনো জমিদারের বাড়ি বা অভিজাত রিসোর্ট
মনে হতে পারে। যেতে যেতে রাস্তার দুই পাশের গাছ-গাছালি আর পাখির কলতানে
গ্রামীণ পরিবেশের ছোঁয়া যেন হৃদয় কেড়ে নেয়। শহর ছেড়ে গ্রামের পথে
প্রতিবেশী দেশ ভারত সংলগ্ন বর্ডারের ডের-দুই কিলোমিটার আগে দেখা মিলল
কারুকার্য অঙ্কিত, দৃষ্টিনন্দন একটি বিদ্যাপিঠের। যেখানে সূর্যের আলোয়
বিদ্যাপিঠটি আলোতে ঝলমল করছে। রাতের জন্য রয়েছে ল্যাম্পশেডও।
প্রকৃতির কাছে, গ্রামীণ পরিবেশের বিদ্যাপিঠটি নান্দনিকতায় যেন নতুন এক
মাত্রা যোগ করেছে। আপন মনে শিশুরা খেলা করছে। মনের আনন্দে লেখাপড়া করছে।
আবার দর্শনার্থীদের ভিড়ে যেন আগ্রহের কেন্দ্রবিন্দু হয়ে দাঁড়িয়েছে
বিদ্যাপীঠটি।
অসাধারণ, সাদামাটা একটি গ্রাম। যেখানে সকাল থেকেই জীবনযুদ্ধ শুরু হয় খেটে
খাওয়া মানুষের। মা-মাটির গন্ধ যেখানে মিশে আছে। সেখানেই আধুনিক পরিবেশে
শিক্ষা লাভ করছে শিক্ষার্থীরা। ভোরে আলো ফোটার পর যেখানে পাখির
কিচির-মিচির শব্দে ঘুম ভাঙে। শিক্ষার জন্য প্রয়োজন একটি সুন্দর এবং মনোরম
পরিবেশ। এখানে শিশুরা মনের আনন্দে খেলা করে। সবুজ দুর্বা ঘাস আর সবুজ
পাতার ফাঁকে তারা যেন শৈশবকে হাসি, ঠাট্টা আর আনন্দ উপভোগ করে কাটিয়ে
দিচ্ছে। বিদ্যালয়টিতে এতটাই আধুনিকতার পরশ রয়েছে যে, এর ভেতরের দৃশ্য
দেখতে প্রতিদিনই অসংখ্য মানুষের আগমন ঘটে। নান্দনিক এ স্কুল দেখে বিস্মিত
হন দর্শনার্থীরা।


বিদ্যালয়টিতে রয়েছে কারুকার্য খচিত, সুসজ্জিত নান্দনিক ভবন। ঠাকুরগাঁও
জেলার হরিপুর উপজেলার বকুয়া ইউনিয়নের চরভিটা গ্রামে অবস্থিত ব্যতিক্রম এ
বিদ্যাপিঠ। দ্বিতল ভবনের ছাদে দেয়া হয়েছে বিদ্যালয়ের নিজ অর্থায়নে
কম্পিউটার ল্যাব। ভবনের উত্তরে হাঁস-মুরগির খামার ও বেগম ফজিলাতুন নেছা
মুজিব লাইব্রেরি এবং পশ্চিম পাশে রয়েছে সিসি ক্যামেরায় মনিটরিং রুম, সততা
কেন্টিন, মসজিদ, মাছ চাষের পুকুর। পুকুরের দুই অংশেই আছে প্রশস্ত রাস্তা।
শিক্ষার্থীদের বিনোদনের জন্য রয়েছে শিশুপার্ক ও মিনি চিড়িয়াখানা।
বিদ্যালয়ের চারপাশে আছে প্রাচীর। বিদ্যালয়জুড়ে গড়ে তোলা হয়েছে এক
মনোমুগ্ধকর পরিবেশ। শিশুদের জন্য খেলার মাঠের এক পাশে আছে দোলনা, গরুর
গাড়ি। পুকুরে নৌকা।
পুকুরের দক্ষিণ ও পূর্ব দেয়ালে আঁকা রয়েছে স্বাধীনতার মহান পুরুষ ও
শহীদের প্রতিকৃতি, কবি সাহিত্যিক, বাঘ, ভালুক, ময়ূর, চিত্রা হরিণ, খরগোশ,
হাতি, বক, কুমিরসহ বিভিন্ন প্রাণীর ছবি। মাটিতে ফুলের গাছ দিয়ে বানানো
হয়েছে ত্রিভুজ, চতুর্ভুজ ও বৃত্ত। আরো রয়েছে সিমেন্টের তৈরি হাতি ও
জিরাফ।
ছুটির ঘণ্টা পড়ে গেলেই শিক্ষার্থীদের মুখ ভার। সব জায়গায় দেখা যায় স্কুল
ছুটি হলে কচিকাঁচাদের দৌড়ে বেরিয়ে আসার দৃশ্য। চরভিটা সরকারি প্রাথমিক
বিদ্যালয় যেন ব্যতিক্রম। স্কুল ছেড়ে ফিরতেই চায় না শিক্ষার্থীরা।
চরভিটা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের নিজ জমিতে সবজি চাষ করা হয়। তাদের
ফলানো সবজি ব্যবহার হয় মিড-ডে মিলে। শীতে ফুলকপি, বাঁধাকপি, ওলকপি, লাল
শাক, পালং শাক। গরমে বেগুন, পেঁপে। তা ছাড়া, বিনামূল্যে কম্পিউটার শেখা,
আবৃত্তি, নাটক শেখা তো আছেই!
ভারতের সীমান্তঘেঁষা এ স্কুলে প্রাক-প্রাথমিক থেকে পঞ্চম শ্রেণি পর্যন্ত
পড়ানো হয়। শিক্ষার্থী সংখ্যা প্রায় ৩৫০। চারজন শিক্ষক-শিক্ষিকা ও তিনজন
প্যারাশিক্ষক রয়েছেন। এলাকাটি কৃষিপ্রধান। বিদ্যালয়ের নিজ উদ্যোগে
শিক্ষার্থীদের দেয়া হচ্ছে মিড ডে মিল এই উদ্যোগের পেছনে রয়েছেন
শিক্ষক-শিক্ষিকা ও বিদ্যালয়ের পরিচালনা কমিটি। শিক্ষকদের উৎসাহে প্রতিদিন
স্কুলে আসা শিক্ষার্থীদের কাছে নেশার মতো!
খামারে হাঁস-মুরগীদের খাবার দিতে ব্যস্ত বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী রাহাত
মাহমুদ জানায়, বিদ্যালয়ে লেখাপড়ার ফাঁকে তারা প্রতিদিন একদল খাবার দেয়
হাঁস-মুরগীদের, অন্য দল সবজি বাগানের পরিচর্যা করে। এই কাজ করতে ওদের
গর্বই হয়।
বিদ্যালয়ের আরেক শিক্ষার্থী রাবেয়া বসরী বলে, সমাপনী পরীক্ষার পর স্কুল
ছেড়ে চলে যাব। স্কুলের জন্য ভালো কিছু একটা করে যেতে পারলে নিজেরও
ভালো লাগবে।
হাঁস-মুরগীর এই খামার বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের জন্যই। খামার থেকে
প্রতিদিন গড়ে ১০০ থেকে ১২০ ডিম পাওয়া যায় ।
পাশের সবজি বাগানে গিয়ে দেখা যায়, শিক্ষার্থীরা ব্যস্ত বাগানের আগাছা
পরিষ্কারে। নিড়ানির পর গাছের গোড়ায় পানি দিচ্ছিল কেউ কেউ। চতুর্থ
শ্রেণির শিক্ষার্থী ফারজানা আকতার বলল, ভালো একটি উদ্দেশ্যে সবাই মিলে এ
কাজ করছি আমরা। স্যারেরা আমাদের সাহায্য করছেন।
সেই ভালো উদ্দেশ্যটি কি? সেটি হলো- বিদ্যালয়ে দুপুরের খাবার (মিড ডে
মিল)। বিদ্যালয়ে ঝরে পড়া রোধে এই কর্মসূচি সরকারিভাবে দেশের প্রতি
উপজেলার একটি করে বিদ্যালয়ে চালু করা হয়। কিন্তু আস্তে আস্তে প্রকল্পটি
বন্ধ হয়ে যায়। হরিপুর উপজেলায়ও তাই হয়েছে। তবে চরভিটা সরকারি প্রাথমিক
বিদ্যালয় এই প্রকল্প পায়নি। কিন্তু প্রধান শিক্ষক এরফান আলী তার
বিদ্যালয়ে মিড ডে মিল চালু করতে চাইলেন। ছুটে গেলেন উপজেলা প্রাথমিক
শিক্ষা কর্মকর্তার কাছে। খালি হাতে ফিরে এলেন, তবে আশা ছাড়েননি তিনি।
চরভিটা গ্রামে এই প্রাথমিক বিদ্যালয়টি ২০০১ সালে এরফান আলীর (প্রধান
শিক্ষক) বাবা নুরুল ইসলাম করেছেন নিজে জমি দিয়ে। ২০১৩ সালে বেসরকারি
প্রাথমিক বিদ্যালয়টি সরকারি প্রতিষ্ঠান হিসেবে স্বীকৃতি পায়।
চরভিটা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক এরফান আলী জানান,
অভাব-অনটনের কারণে অনেক শিক্ষার্থী বিদ্যালয়ে খুব একটা হাজির হতো না।
২০১৩ সালেও চরভিটা প্রাথমিক বিদ্যালয়ে ১৫০ শিক্ষার্থী ছিল, কিন্তু
প্রতিদিন হাজির থাকত ৬০ থেকে ৭০ জন। বিষয়টি নিয়ে ভাবনায় পড়লেন।
শিক্ষার্থীদের বিদ্যালয়মুখী করা এবং ঝরে পড়া রোধে নিজেই উদ্যোগ নিলেন।
উপজেলা শিক্ষা অফিস তাকে বিমুখ করলেও থেমে যাননি তিনি। বিদ্যালয় পরিচালনা
কমিটি, স্থানীয় গণ্যমান্য ব্যক্তি ও অভিভাবকদের নিয়ে মতবিনিময় সভা
ডাকলেন। পড়ালেখায় শিক্ষার্থীদের মনোযোগ ধরে রাখতে বিদ্যালয়ে মিড ডে
মিল’ চালুর পরিকল্পনার কথা জানালেন তাদের। তার পরিকল্পনায় সবাই সম্মতি
দিলেন। এরপর কাজে নেমে পড়লেন তিনি। বাড়ি বাড়ি গিয়ে সবাইকে তার
উদ্যোগের কথা জানালেন। গ্রামবাসী পাশে থাকার আশ্বাস দিলেন। গ্রামের
লোকজনকে নিয়ে দরিদ্র এই এলাকার স্কুলে মিড ডে মিল চালু করলেন। প্রতি
মাসে এর জন্য ৩০ থেকে ৩৩ হাজার টাকা খরচ লাগে। কিন্তু প্রত্যন্ত এলাকায়
মাসে মাসে এত টাকার জোগান নিশ্চিত করা সম্ভব হয় না। এই অবস্থায় স্থায়ী
আয়ের কথা ভাবলেন প্রধান শিক্ষক। এই উদ্যোগ চালু রাখতে বিদ্যালয়ের
ব্যবস্থাপনা কমিটির সভাপতি নুরুল ইসলাম নিজের ছয় বিঘার একটি পুকুর ও
দুইবিঘা জমি বিদ্যালয়কে ব্যবহার করতে দিয়েছেন। এ ছাড়া তিনি নিজের দোকান
থেকে প্রতি মাসের লবণ ও তেলের জোগান দেন।
সেই পুকুরেই চলছে মাছ চাষ, হাঁস-মুরগির খামার, জমিতে সবজি। প্রধান শিক্ষক
জানালেন, এই তিন খাত থেকে মাসে যে টাকার আয় হয়। দ্বিতীয় শ্রেণির নিচের
শিক্ষার্থীদের সকালে এবং তার ওপরের শ্রেণির শিক্ষার্থীদের দুপুরে খাবার
দেয়া হয়। সপ্তাহে তিন দিন দেয়া হয় খিচুড়ি, সাথে একটি করে ডিম। সচ্ছল
পরিবারের শিক্ষার্থীরা সপ্তাহে এক দিন বাড়ি থেকে মুঠো চাল নিয়ে আসে।
সপ্তাহের বাকি তিন দিন দেয়া হয় পাউরুটি, সাথে কলা বা ডিম। ডিম অবশ্যই
বিদ্যালয়ের নিজ খামারের।
প্রধান শিক্ষক এরফান আলী জানান, ‘মিড ডে মিল’ চালু করায় স্কুলে
শিক্ষার্থী বাড়ছে, সেই সুবাদে তিনি মনে করেন তার স্কুল এখন সেরা।
পঞ্চম শ্রেণির শিক্ষার্থী আবু হাসান বলল, স্কুলে দুপুরের খাবার না পেলে
আমার হয়তো স্কুলেই আসা হতো না। স্কুলের খাবার খেয়ে আমরা এখন নিশ্চিন্তে
পড়ালেখা করতে পারছি।
অভিভাবক অজয় দাস, শহিদুল ইসলাম জানান, এখন বাচ্চারা বাড়ির খাবারের থেকে
মিড-ডে মিল খেতে বেশি আগ্রহী। ছেলে-মেয়েরা যে চাষাবাদ ও অনেক কিছু শিখছে,
তাতে তারা খুশি।
চরভিটা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক নারগিস আক্তার বলেন,
আমরা বাচ্চাদের বিভিন্ন শিক্ষা উপকরণ দিয়ে পাঠদান দেই, ফলে তারা পাঠে
মনোযোগী হয়। বাচ্চাদের খেলাধুলার জন্য বিভিন্ন রকমের খেলনা আছে। বিনোদনের
জন্য একটি পার্ক আছে। পার্কে বাচ্চারা অবসর সময়ে প্রকৃতির সাথে সময়
কাটাতে পারে। তাছাড়া বিদ্যালয়ের নিজ অর্থায়নে তৈরি কম্পিউটার ল্যাব রয়েছে
বাচ্চারা বিনা মূল্যে কম্পিউটার শিখতে পারে। সততা কেন্টিন আছে খুদা লাগলে
খেতে পারে। সর্বোপরি বাচ্চাদের রেজাল্ট অনেক ভালো।
হরিপুর উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিসার আজিজার রহমান বললেন, চরভিটা সরকারি
প্রাথমিক বিদ্যালয় হরিপুর উপজেলার অন্যতম একটি বিদ্যালয়। এখানে
শিক্ষার্থীদের মনোযোগ আকর্ষণের জন্য সৃজনশীল অনেক কিছু জিনিস আছে যা
শিক্ষার্থীদের মনকে দোলা দেয়। বিদ্যালয়টি দিন দিন উত্তরোত্তর বৃদ্ধি
পাচ্ছে, এলাকাবাসী সম্পৃক্ত হচ্ছে। আশাকরি বিদ্যালয়টি এক দিন জাতীয়
পর্যায়ে উন্নত হবে।